

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বাংলা পাণ্ডুলিপি পাঠ, সংরক্ষণ ও কালনির্ণয়ের পদ্ধতি এবং মধ্যযুগের বাংলা প্রণয়োপাখ্যানের বিকাশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্ট লেকচার ও কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিশেষভাবে শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্যের পাণ্ডুলিপি-পরম্পরা, ভাষা, রাজপ্রশস্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা হয়।
রবিবার (৩০ আগস্ট) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের উদ্যোগে এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (AIBS) সহযোগিতায় ‘বাংলা পাণ্ডুলিপি ও শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জোলেখা’ শীর্ষক এ গেস্ট লেকচার অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসেন।
ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শহিদুল হাসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন AIBS-এর উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম।
আলোচনায় বাংলা পাণ্ডুলিপির সংজ্ঞা ও ধরন, লেখপত্র, কালি ও কলম, লিপিকর, পুষ্পিকা, লিপিকরপ্রমাদ, পাঠান্তর ও পাঠ-প্রক্ষেপণসহ পাণ্ডুলিপির কালনির্ণয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি তুলে ধরা হয়। তারিখযুক্ত ও তারিখবিহীন পাণ্ডুলিপির সময়কাল নির্ধারণে ভাষা, লিপি, লেখপত্র, স্থাননাম, ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক-সামাজিক ঘটনার মতো অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সূত্রের গুরুত্ব নিয়েও আলোচনা করা হয়।
সেমিনারে মধ্যযুগের বাংলা প্রণয়োপাখ্যানের বিকাশ ও বৈশিষ্ট্যও উঠে আসে। ‘ইউসুফ-জোলেখা’, ‘লায়লী-মজনু’, ‘মধুমালতী’ ও ‘সয়ফুল-মুলক’-এর মতো আখ্যানের মধ্য দিয়ে আরবি-ফারসি, ভারতীয় ও লোকায়ত প্রেমকাহিনির পারস্পরিক প্রভাব বাংলা সাহিত্যে কীভাবে নতুন আখ্যানরীতির জন্ম দিয়েছে, তা তুলে ধরা হয়।
আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’। প্রবন্ধে সগীরকে প্রাপ্ত প্রাচীনতম বাংলা কাব্যের অন্যতম কবি হিসেবে বিবেচনার ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপি-পরম্পরা, রাজপ্রশস্তি, ভাষার প্রাচীন স্তর ও দেশীয় সাংস্কৃতিক উপাদানের উপস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।
বক্তারা বলেন, ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কোনো সরল অনুবাদ নয়। কোরআনের কাহিনিকে মূল আকর হিসেবে গ্রহণ করে সগীর বাংলা ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি ও নন্দনরীতির মধ্য দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক আখ্যানকে সৃজনশীলভাবে পুনর্গঠন করেছেন।
এ ছাড়া কাব্যটিতে ‘ধর্ম’ শব্দের ব্যবহার, ‘বঙ্গাল-গৌড়’ রাজনৈতিক ভূগোল এবং রাজপ্রশস্তির ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়েও আলোচনা হয়। শাহ মুহম্মদ সগীর, আবদুল হাকিম ও গরীবুল্লাহর রচনার তুলনামূলক পাঠের মাধ্যমে একই কাহিনির বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে ড. শহিদুল হাসান এমএ শিক্ষার্থীদের বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক ইতিহাস লেখার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জোলেখা’ কাব্যের নিবিড় পাঠের ওপর শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ড. শহিদুল হাসান বলেন, ২০২৫ সালে তিনি এবং বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হোসেন হাঙ্গেরিতে অনুষ্ঠিত পঞ্চম মধ্যবাংলা পুথি সামার স্কুল, রিট্রিট ও কর্মশালায় অংশ নেন। AIBS-এর ফেলোশিপের মাধ্যমে তাঁরা সেখানে যাওয়ার সুযোগ পান। কর্মশালায় শেখা বাংলা পুথি পাঠের কৌশল ও পদ্ধতিই এদিন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে।
অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম বলেন, AIBS মূলত একাডেমিক এক্সচেঞ্জ, গবেষণা, পেশাগত উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সমঝোতা রয়েছে। এর আওতায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ফেলোশিপ, ট্রাভেল গ্রান্ট, গবেষণা ও পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশি বিষয় নিয়ে গবেষণা করা শিক্ষার্থীদেরও AIBS বিভিন্নভাবে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষা নেওয়া শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে গবেষণা করতে এলে তাদের জন্যও ফেলোশিপ ও গবেষণা সহায়তার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিয়ে একাডেমিক লেকচার, সেমিনার ও গবেষণা বিনিময়ের আয়োজন করা হয়।
অধ্যাপক রবিউল ইসলাম আরও জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে AIBS-এর একাডেমিক সহযোগিতা রয়েছে। শিক্ষার্থী ও তরুণ শিক্ষকদের গবেষণা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ডেইলি কলমকথার সকল নিউজ সবার আগে পেতে গুগল নিউজ ফিড ফলো করুন
দৈনিক কলম কথা সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।